- Jan 26, 2026
- 3
- 25
- 187
19 day ago
|
All Level
ইসলামী বিধান সমূহের শ্রেণীবিভাগ ও 'মুবাহ'-এর স্থান
ইসলামী জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে যাদের পরিষ্কার ধারণা নেই, সেরকম অনেকেই মনে করে থাকেন যে, ইসলাম মানতে গেলে হাজারো বিধি-নিষেধের শৃংখলে জীবন অতিষ্ঠ হতে বাধ্য। অবশ্য অনেক আলেমগণও এই ধারণা পোষণ করে থাকেন এবং এ ব্যাপারে দলিল হিসেবে আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত এই হাদিসটি পেশ করে থাকেন যা নি:সন্দেহে একটি সহীহ হাদিস।
আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "দুনিয়া মুমিনের জন্য জেলখানা এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।" [মুসলিম ২৯৫৬, তিরমিযি ২৩২৪, ইবন মাজাহ ৪১১৩, আহমদ ৮০৯০, ২৭৪৯১, ৯৯১৬]
এই হাদিসের ভাষ্য অনুসারে ইসলামী জীবন ব্যবস্থা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করতে চাইলে তাকে স্বেচ্ছায় বন্দী জীবনকে বরণ করে নিতে হবে। অর্থাৎ সে যা ইচ্ছা তাই করে বেড়াতে পারবে না। আর এই উপমা যেহেতু সহীহ হাদিসে আছে তাই তাকে ভুল বলারও কোন সুযোগ নেই। কারণ জেলখানায় যেমন স্বাধীনভাবে জীবন যাপন করা যায় না, ঠিক তেমনি দুনিয়ার জীবনও শুধু ভোগ-বিলাসের জন্যে নয়।
তবে একথাও ঠিক যে, ইসলামে মানুষের জীবন-যাপনের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে যেমন সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, ঠিক তেমনি তা মানার ক্ষেত্রে গুরুত্ব বিবেচনা করে হুকুম-আহকাম গুলোকে এতোটাই সুন্দর পন্থায় শ্রেণীবিন্যাসিত করা হয়েছে যে, সেগুলো মানার ক্ষেত্রে প্রত্যেক মুসলিম অনেক ধরনের স্বাধীনতাও ভোগ করে থাকেন।
ইসলামের বিধি-বিধান সমূহকে প্রধানত: তিনটি শ্রেণীতে বিভক্ত করে বর্ণনা করা যায়। এক শ্রেণী হলো আদেশ করা ও উৎসাহ প্রদান সম্পর্কিত আর অন্য শ্রেণী হলো নিষেধ করা ও নিরুৎসাহিত করণ সম্পর্কিত। যে সকল কার্য সম্পর্কে আল্লাহ ও আল্লাহর রসূলের সুস্পষ্ট আদেশ রয়েছে বা যেসব কাজ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে সেসব পালনে যেমন পূণ্য হাসিল করা যায়, ঠিক তেমনি যে সকল কার্যের ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আছে বা যেসব কাজ করতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে সেসব হতে বিরত না থাকলে গুনাহগার বা নিদেনপক্ষে তিরস্কৃত হতে হয়।
আর তৃতীয় আরেকটি শ্রেণী হচ্ছে, যে ব্যাপারে আদেশ ও উৎসাহ অথবা নিষেধ ও নিরুৎসাহ কোনটিই করা হয়নি। এই শ্রেণীর কার্যকে সাধারনত: 'মুবাহ' বলা হয়ে থাকে যা সম্পাদনে পূণ্য বা পাপ কোনটিই হয় না। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বেশীরভাগ কাজই 'মুবাহ' শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। আর ইসলামের একটি সাধারণ নীতিমালা হচ্ছে, সকল কাজই বৈধ বা হালাল হিসেবে বিবেচিত হবে, শুধুমাত্র সে সকল কার্য ব্যতীত যা হারাম বা মাকরূহ হওয়ার ব্যাপারে দলিল পাওয়া যায় অথবা যে সকল কার্যের হালাল হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।
উপরোক্ত সাধারণ নীতিমালা অনুসারে 'মুবাহ' শ্রেণীর কার্য সাধারনভাবে হালাল হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে, যদি না তার সাথে হারাম বা মাকরূহ শ্রেণীর কোন কাজের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। আর একটি মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই 'মুবাহ' শ্রেণীর অনেক কার্যকেই ইবাদতে রূপান্তরিত করে পূণ্য হাসিল করা সম্ভব শুধুমাত্র নিজের মনের সঙ্কল্প তথা নিয়তকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের দিকে ডাইভার্ট করে! যেহেতু প্রতিদিনের বেশীরভাগ কাজই 'মুবাহ' শ্রেণীর হয়ে থাকে, তাই শুধু নিজের নিয়তকে ঠিক করার জন্যে কিছু সময় ব্যয় করার মাধ্যমে আমরা অতিরিক্ত অনেক পূণ্য হাসিল করতে পারি সেই একই কাজ সমাধা করার মাধ্যমে, নিয়ত ঠিক না থাকলে যা সম্পাদনে আমাদের কোন নেকী হয় না।
আদেশের ক্ষেত্রে, যা পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালার সরাসরি আদেশ অথবা রসূল (সা:) কর্তৃক ঘোষিত আল্লাহর আদেশ হিসেবে স্বীকৃত সেগুলোকে 'ফরজ' ও 'ওয়াজিব' হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে যা প্রত্যেক মুসলিমের জন্যে অবশ্য পালনীয়। অবশ্য ফরজ শ্রেণীর এবাদতকে আবার দুই প্রকারে ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। যেমন-প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যে যা অবশ্য পালনীয় তাকে 'ফরজে আইন' বলা হয়ে থাকে। যথা-নামাজ, রোযা, হজ্জ্ব প্রভৃতি পালন। অন্যদিকে যা গোষ্ঠীবদ্ধভাবে অবশ্য পালনীয় অর্থাৎ সমাজের একাংশ যদি তা পালন করে তাহলে সবাই দায় থেকে মুক্তি পায়, কিন্তু কেউ যদি তা পালন না করে তাহলে ঐ সমাজের সকলেই গুনাহগার হয়, এরূপ কার্যকে 'ফরজে কেফায়া' বলা হয়ে থাকে। যথা-জানাযার নামাজ, আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান এবং অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করা প্রভৃতি।
আর আল্লাহর অন্য যে সকল আদেশ রসূলুল্লাহ (সা:) নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করেছেন অথবা অন্যদেরকে পালনের নির্দেশ দিয়েছেন বা তাদের কোন কাজকে সম্মতি সূচক মৌন সমর্থন দিয়ে উৎসাহিত করেছেন বা অন্ততঃপক্ষে নিষেধ করেননি সেগুলো 'সুন্নাহ' হিসেবে স্বীকৃত। এই সুন্নাহও দুই প্রকারের হয়ে থাকে - একটি হলো, 'সুন্নতে মোয়াক্কাদাহ' যাকে অবশ্য পালনীয় হিসেবে ধরা হয় ও ছেড়ে দিলে গুনাহ হয়। আর অন্যটি হচ্ছে, 'সুন্নতে যায়েদা' যা পালন করা আমলকারীর ইচ্ছাধীন অর্থাৎ পালন করলে পূণ্য হবে, কিন্তু ছেড়ে দিলে কোন গুনাহ হবে না। এছাড়া অন্যান্য 'মুস্তাহাব বা নফল' ইবাদত, যেমন - নফল নামাজ সাধারনত: এই প্রকৃতির হয়ে থাকে যা পালনে অনেক সওয়াবের অধিকারী হওয়ার সুযোগ থাকলেও ইসলাম এ ব্যাপারে আমলকারীকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছে।
অন্যদিকে নিষেধ সংক্রান্ত নির্দেশগুলো দুই প্রকারের হয়ে থাকে। একটি হলো, 'হারাম' যা হতে বিরত থাকা বাধ্যতামূলক। আর অন্যটি হচ্ছে, 'মাকরূহ' যা হতে বিরত থাকাও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে জরুরী; কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা না মানা হলে সে আল্লাহর নৈকট্যশীল বান্দা হওয়ার দৌড়ে পিছিয়ে পড়ার পাশাপাশি কার্যের গুরুত্ব বিবেচনায় কোথাওবা সে গুনাহগার হবে আবার কোথাও গুনাহগার না হলেও সে আল্লাহর নিকট তিরস্কৃত হবে।
এই 'মাকরূহ' শ্রেণীর কার্যকেও আবার দুই প্রকারে ভাগ করে বর্ণনা করা হয়, যথা - 'মাকরূহ তাহরীমি' ও 'মাকরূহ তানযীহি'। যে সকল কাজ সরাসরি হারাম না হলেও হারামের কাছাকাছি পর্যায়ের অপরাধ এবং যা থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে খুবই কঠিনভাবে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, তাদেরকে 'মাকরূহ তাহরীমি' বলা হয়। এই ধরণের কাজ হতে বিরত না থাকলে গুনাহগার হতে হয়। অন্যদিকে, যেসব কাজ নিষেধ করা হয়নি কিন্তু অপছন্দনীয় তাদেরকে 'মাকরূহ তানযীহি' বলা হয়। এই কাজগুলো যদিও মানুষকে শাস্তির দিকে পরিচালিত করবে না, তবে আল্লাহর নৈকট্যশীল বান্দা হওয়ার জন্য এই কাজগুলো এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।
সকল আদেশ ও নিষেধের ক্ষেত্রে একটি সাধারন নীতিমালা হলো, 'ফরজ' ও 'ওয়াজিব' পালন এবং 'হারাম' থেকে বিরত থাকা না হলে কবীরা গুনাহ বা বড় পাপ হবে যার ভয়ানক শাস্তির কথা হাদীসের বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে। এ প্রকৃতির গুনাহ তওবা না করা পর্যন্ত কখনোই মাফ হয় না। অন্যদিকে উল্লেখিত আদেশ ও নিষেধ ব্যতীত অন্য সকল হুকুম না মানার ক্ষেত্রে ছগীরা গুনাহ বা ছোট পাপ হয়ে থাকে যা অনেক সময় নেক আমল বেশী বেশী করার কারণে অথবা অসুস্থতা বা অন্য কোন প্রকৃতির কষ্ট ও পরীক্ষায় ফেলে আল্লাহ মাফ করে দেন।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে একথা সহজেই বোঝা যায় যে, ইসলামের বিধানগুলোর মধ্যে 'মুবাহ', 'সুন্নতে যাদেয়া' ও 'মুস্তাহাব বা নফল' - এই তিন শ্রেণীর কার্যের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশী। তাই ইসলাম মানার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক (mandatory) বিধানের তুলনায় ঐচ্ছিক (optional) বিষয় সমূহ যা পালন করা বা না করা ব্যক্তির ইচ্ছাধীন তার সংখ্যা বেশী হওয়ার বিষয়টি এটাই নির্দেশ করে যে ইসলামে ধর্ম পালনের ব্যাপারে আল্লাহ মানুষকে অনেক স্বাধীনতা যেমন দিয়েছেন, ঠিক তেমনি বেশী বেশী পূণ্য হাসিলের বাড়তি সুযোগও রেখেছেন যাতে করে নেককার ব্যক্তির পক্ষে সহজেই আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সেই সাথে পরকালীন জীবনের সফলতা অর্জন করা সম্ভব হয়।
আল্লাহ আমাদের সকলকে উপরোক্ত আলোচনার মর্ম উপলব্ধি করত: শরীয়তের বিধানগুলোকে গুরুত্বের ভিত্তিতে পার্থক্য করার এবং সচেতনভাবে বুঝে তা মানার তৌফিক দান করুন।
You may also like to read others
জীবন গঠনের মূলনীতি
Jan 13, 2026
নিজের জীবনের ব্যাপক ও কার্যকর পরিবর্তনের উপায়
Jan 25, 2026
জীবনে PASSION-ই সফলতার মূল চাবিকাঠী
Jan 25, 2026